যাত্রা জগতের কিংবদন্তি অভয় হালদারের প্রয়ান দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলী

District News Kolkata

নিউজ ফ্রন্টলাইনার ওয়েব ডেস্ক,১০ ই মার্চ,
বাংলা রঙ্গমঞ্চে অভিনেতাদের উদ্যেশ্যে একটা প্রবাদ আছে দেহপট সনে নট সকলি হারায়।কিন্তু সবকিছুকে যদি এইভাবে হারিয়ে ফেলি তাহলে আমাদের অস্তিত্ব কিংবা বেঁচে থাকা যে ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে যাবে। তাই হারায়ে খুঁজবো তাঁদের যাঁরা আমাদের বেঁচে থাকার এবং মঞ্চে পা রাখার সূতিকাগার।

আজ আমরা এমন একটা মানুষের স্মৃতি তর্পণ করতে কলম ধরেছি যে মানুষটার উত্তরণ অভিনয় শিল্পের আঁতুড়ঘর যাত্রা নামক শিল্প মাধ্যম থেকে।যাত্রা জগতের সেই কিংবদন্তী শিল্পী এবং ভদ্রজন অভয় হালদারের আজ একবিংশতম প্রয়াণ দিবস।১৯২৬ সালের মাঝামাঝি সময় অভয় হালদারের জন্ম হুগলী জেলার হুগলী নামক স্টেশনের নিকটবর্তী অঞ্চলে।অভয় হালদারের পিতা ছিলেন এক রক্ষণশীল পরিবারের সন্তান।চাকরিসূত্রে তাঁর পিতা কলকাতার অহিরীটোলা অঞ্চলের ভাড়া বাড়ীতে বসবাস শুরু করেন।অভয় হালদার ছিলেন তাঁর পিতার একমাত্র পুত্র সন্তান।অভয় হালদার ছিলেন এক ভাই এবং পাঁচ বোন।পরবর্তীকালে অভয় হালদারের পিতা পাকাপাকিভাবে আপন বসতি স্থাপন করেন বেলগাছিয়া দত্তবাগান অঞ্চলে ২৭ নম্বর জীবনকৃষ্ণ মিত্র রোডে।সেখানেই বড় হতে থাকে অভয় হালদার।

আই-এ উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি চাকরি পান কাশীপুর গান এ্যান্ড শেল ফ্যক্টরিতে।যে কোনো কারণেই চাকরি অভয় হালদারের কপালে টেকেনি এবং ফলস্বরূপ বেকারত্বের জ্বালা তাঁকে পৌঁছে দেয় যাত্রার অঙ্গনে।কবিতা,অভিনয় বা উচ্চারণের ব্যাপারে সফল স্বকীয়তায় মুগ্ধ হয়েই অভয় হালদারকে লুফে নিয়েছিলো চিৎপুর রবীন্দ্রকানন কোম্পানী বাগানের যাত্রা মালিকেরা।পাড়ায় বেশ কয়েকবার সখের অভিনয় করেছেন তিনি।অভয় হালদারের সহধর্মিণী মীরা হালদার।সাংসারিক জীবনে তাঁর চার পুত্র সন্তান অমিয়শঙ্কর,সিদ্ধার্থশঙ্কর,দেবশঙ্কর,শিবশঙ্কর এবং এক কন্যা সন্তান সারদা।একবার এক প্রখ্যাত অভিনেতা আচার্য পূর্ণেন্দু শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় অভয় হালদারকে মজা করে প্রশ্ন করেছিলেন “অভয় এতদিন তো অভিনয় করলে,ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় হিসেবে কি রেখে যাচ্ছ ?” তখন সেই প্রশ্নের উত্তরে অভয় হালদার জবাব দিয়েছিলেন “আমার চার পুত্র এবং এক কন্যাকে রেখে গেলাম,এরাই তো আমার সঞ্চয়”। তাঁর এই বলে যাওয়া উক্তি অক্ষরে অক্ষরে সত্যি।তিনি প্রয়াত হন ১৯৯৯ সালের ১০ই মার্চ ৭৩ বছর বয়সে আজকের দিনটিতে।জীবদ্দশায় টানা ৪০ থেকে ৪৫ বছর যাত্রা শিল্পের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন।শুধু মৃত্যুর ঠিক আগের চার কি পাঁচ বছর অন্তরালে চলে গেছিলেন দুরারোগ্য শারীরিক অসুস্থতার কারণে। যাত্রায় বরাবরই ছিলো বাবু কালচার।তাই প্রায় অধিকাংশ শিল্পীই ছিলো অবহেলিত এবং অত্যাচারিত।তখন ছিলো চারিদিক খোলা মঞ্চ।মেকআপ রুম ছিলো আসর থেকে ২৫ মিটার মতন দূরে।সেখান থেকে কণ্ঠে সংলাপ বহন করে শিল্পীকে আসরে প্রবেশ করতে হতো।নিজের মেকআপ নিজে করাই ছিলো যাত্রা জগতের রীতি।অভয় হালদারের সময়কালে দর্শকসংখ্যা শুরুই হতো কমপক্ষে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার।স্নেহের আলিঙ্গনে যেমন অভয় হালদারকে বেঁধে নিয়েছিল অগণিত মানুষ ঠিক তেমনই তাঁকে উৎপীড়ন করার লোকেরও অভাব ঘটেনি।যে পরম্পরা আজও অক্ষত।যাত্রা জগতের অন্যতম ভদ্রজন হিসেবে সমাজে চিহ্নিত হয়েছিলেন তিনি।আজও বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যে সমস্ত বর্ষীয়ান মানুষ বেঁচে আছেন তাঁরা দুহাত কপালে ঠেকিয়ে আজও স্বীকার করেন অভয় হালদারের মতন একজন ভালোমানুষ অভিনয় শিল্পে বিরল যার ধারা আজও বহন করে চলেছে তাঁর পুত্র কন্যা এবং পুত্রবধূরা।

যাত্রা শিল্পীরা চূড়ান্ত বেহিসেবী জীবনযাপন করতেন ঠিকই কিন্তু অভয় হালদার এমনই একজন ভদ্র মানুষ ছিলেন যিনি তাঁর জীবনযাত্রা দিয়ে বাকীদের সুপথে প্রভাবিত করতেন।অভয় হালদার যাত্রায় খল চরিত্রে অভিনয় করতেন।তাঁর অভিনয়ের অনুরাগী ছিলেন আপামর বাঙালী। অসংখ্য পালাগান করেছেন তিনি যাত্রায় এবং থিয়েটারে।অসিত বসু,উৎপল দত্ত এবং বিভাস চক্রবর্তীর নির্দেশনাতে কাজ করেছেন অভয় হালদার।তিনি যাত্রায় তদানীন্তনকালে তিনবার দিশারী পুরস্কার পেয়েছিলেন। এছাড়া রবীন্দ্রকানন প্রাঙ্গণে ১৯৭৬ সালে পেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যাত্রা উৎসব উপলক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রাভিনেতা হিসেবে পুরস্কার মায়ামৃগ যাত্রাপালার জন্য।অভয় হালদার ছিলেন নিয়মানুবর্তিতার অন্যতম নিদর্শন।অবশ্যই কোনো নটনাথের নির্দেশে অভয় হালদার অভিনয়ের শিকড় ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন তাঁর দুই পুত্র অমিয়শঙ্কর হালদার এবং দেবশঙ্কর হালদারের মধ্যে। নট্টকোম্পানী ছাড়া প্রায় প্রতিটি যাত্রাদলে অভিনয় করেছিলেন তিনি।অভয় হালদার অভিনয় করতেন যেসব যাত্রাদলে সেগুলির মধ্যে অন্যতম আর্য অপেরা,রয়্যাল বীণাপানি অপেরা,
সত্যম্বর অপেরা,নবরঞ্জন
অপেরা,আনন্দমেলা যাত্রা সংস্থা,সুশীল নাট্য কোম্পানী,জনতা অপেরা,
মোহন অপেরা,তারা মা অপেরা।অভয় হালদার অভিনীত যাত্রাপালাগুলি যথক্রমে ব্রজেন দের বাঙালী,রক্তে রোয়া ধান,পাগল ঠাকুর,নাগরদোলা,বারুদ,বিপ্লবী ভিয়েতনাম,রাহুমুক্ত রাশিয়া, গণদেবতা,রক্তাক্ত আফ্রিকা,
নরনারায়ণ,জুলিয়াস সীজার,ফুলনদেবী, পাষাণপ্রতিমা এবং মহানায়ক
উত্তমকুমারের নির্দেশনায় যাত্রাপালা করেছিলেন জীবনসঙ্গী।যে সমস্ত দিকপাল আসর মাতিয়ে রাখা অভিনেতাকে সহশিল্পী হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভোলা পাল,আচার্য পুর্নেন্দু শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়,ফনীভূষণ বিদ্যাবিনোদ ( বড় ফনীবাবু),গোপাল চট্টোপাধ্যায়,ফনীভূষণ মতিলাল ( ছোট ফনী),পঞ্চু সেন,দেবেন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং স্বপন কুমারের বড়দা প্রথিত যশা অভিনেতা বিজন মুখোপাধ্যায়।এছাড়া পান্না চক্রবর্তী,অনাদি চক্রবর্তী,শেখর গাঙ্গুলী,সুজিত পাঠক,মোহন চট্টোপাধ্যায়,দুলাল চট্টোপাধ্যায়,দিলীপ চট্টোপাধ্যায়,নির্মল মুখোপাধ্যায়,স্বপন কুমার প্রমুখ।অভয় হালদার প্রথম দিকে যখন যাত্রায় অভিনয় করতেন তখন পুরুষরাই মহিলা সাজতেন।তাঁদের মধ্যে অন্যতম বাবলিরাণি,পুতুলরাণি এবং ছবিরাণি।মোহন চ্যাটার্জির পুত্র উৎপল চ্যাটার্জির সাথেও যাত্রায় অভিনয় করেছিলেন তিনি।উৎপল চ্যাটার্জির সাথে তারা মা অপেরায় অভয় হালদার অভিনয় করেছিলেন সুখের ঘরে আগুন যাত্রাপালায়।যে সমস্ত দিকপাল অভিনেত্রীকে অভয় হালদার সহ অভিনেত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম জ্যোৎস্না দত্ত,বর্ণালী ব্যানার্জী,বীণা দাশগুপ্তা,মীনাক্ষী দে,লীনা চক্রবর্তী,অঞ্জনা ব্যানার্জী এবং ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।আকাশবাণীতে নিয়মিত প্রতি বুধবার যাত্রানুষ্ঠান সম্প্রচারের সময় অধিকাংশ যাত্রাপালাতেই মুখ্য ভূমিকায় পাঠ করতেন তিনি।অভিনেতার কোনো জাত নেই,ধর্ম নেই, কোনো প্রেক্ষাপট নেই,অভিনয় করতে গেলে শুধু প্রয়োজন একজন ভালো মানুষের এ সত্য বার বার প্রমাণ করে চলেছেন হালদার পরিবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *