জন্মদিনে স্মরণে শ্রদ্ধায় উৎপল দত্ত

District News

নিউজ ফ্রন্টলাইনার ওয়েব ডেস্ক,কলকাতা,২৯শে মার্চ,রজত মল্লিক,:”আমি শিল্পী নই,নাট্যকার বা অন্য যে কোনো আখ্যা লোকে আমাকে দিতে পারে।
তবে আমি মনে করি আমি প্রপাগান্ডিস্ট।এটাই আমার মূল পরিচয়।” ...........উৎপল দত্ত

১৯৯৩ সালের ১৯শে আগস্ট চলে গেছেন মানুষটা কিন্তু যাবার আগে বাংলা থিয়েটারকে একশ বছর এগিয়ে দিয়ে গেছেন।আক্ষেপের কথা এতদিনেও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণকারী খুঁজে পাওয়া যায় নি। অসম্ভব কৌতুকপ্রিয় এবং তাঁর নাটকের ওপর আঘাতের পর আঘাত রুখে দেওয়া নির্ভীক চরিত্রের এবং তাঁর দলের সদস্যদের কাছে স্নেহ পরায়ণ পিতার মত ছিলেন তিনি। টিনের তলোয়ারের বেণীমাধব চাটুজ্জের সংলাপে আমরা যেন তাঁকেই খুঁজে পাই “আমি কাষ্ঠপুত্তলির চক্ষু উন্মিলিত করতে পারি,পাথরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারি,গাধা পিটিয়ে ঘোড়া বানাতে পারি।” তাঁর কলম আজও সযত্নে রাখা,যে কলম চালানোর কলমচি আজও জন্মালো না।উৎপল দত্তের শূন্যস্থান কখনই পূরণ হওয়ার নয় এবং তাঁর সৃষ্ট কলাপাতা ও বলা কথা আজও প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী।

১৯২৯ সালের ২৯ শে মার্চ বাংলাদেশের বরিশালে অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের কীর্তনখোলায় জন্মগ্রহণ করেন বাংলা রঙ্গমঞ্চের একনিষ্ঠ নাট্যশিক্ষক,নাট্যকার,নির্দেশক ও অভিনেতা উৎপল দত্ত।পুরো নাম উৎপলরঞ্জন দত্ত।পিতা গিরিজারঞ্জন দত্ত।ইংরাজী অনার্স সহ স্নাতক ছিলেন তিনি।কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ জীবনে ফাদার উইভারের তত্ত্বাবধানে নাট্যচর্চার সূত্রপাত। প্রথম অভিনয় কলেজে হ্যামলেট নাটকে।

কলেজ পত্রিকায় স্যাটায়ারধর্মী একটি ইংরেজি একাঙ্কিকা বেটি বেলসাজার লিখেছিলেন ১৯৪৮ সালে। তার ঠিক এক বছর আগে তৈরী করেন নিজস্ব নাট্যদল
“দ্য অ্যামেচার শেকসপিয়ারিয়ানস”।ব্রিটিশ পেশাদার নাট্যদল শেকসপিয়ারিয়ানা ইণ্টারন্যাশনাল থিয়েটার কোম্পানী কলকাতা সফরে এসে উৎপল দত্ত ও তাঁর দলের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হন এবং সেই দলের নির্দেশক জিওফ্রে কেন্ডালের কাছেই তিনি শিক্ষিত ও দীক্ষিত হলেন থিয়েটারের
শৃঙ্খলায় তাঁর নিয়মানুবর্তিতায়।

এই দলের সঙ্গে প্রথমবার ভ্রমণের পর ফিরে এসে তিনি তাঁর নাট্যদলের নতুন নামকরণ করলেন লিটল থিয়েটার গ্রূপ অর্থাৎ এল.টি.জি।এই দলে তাঁর অভিনীত একাধিক ইংরাজী নাটক এবং এল.টি.জি-র শেষ ইংরেজি প্রযোজনা আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান।এরপর ১৯৫১ সালে তিনি বাংলা নাটকের মূল স্রোতে ফিরলেন বিদেশি নাটকের বঙ্গানুবাদ নিয়ে।প্রযোজনা করলেন দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস এবং আরও নাটক। ওই বছরই তিনি ভাগনাস-এর সঙ্গে যুক্ত হলেন ও সেখানে মঞ্চস্থ করলেন রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন।নিজে অভিনয় করলেন গোবিন্দমানিক্যর ভূমিকায়।নাট্য প্রযোজনা পরিচালনা ও অভিনয়ের বিচিত্র অভিজ্ঞতার পর ইংরাজী থেকে বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে নাট্য রচনার শিক্ষানবিশি করে ১৯৫৮ সালে তিনি প্রথম মৌলিক বাংলা নাটক লিখলেন ছায়ানট।

ইতিমধ্যে দলে এসে গেছেন শোভা সেন,নীলিমা দাস,সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়,শেখর চট্টোপাধ্যায়,রবি ঘোষ প্রমুখ।এমতবস্থায় ১৯৫৯ সালে উৎপল দত্ত তাঁর দল নিয়ে মিনার্ভায় অভিনয় করার জন্য রঙ্গালয়টি ভাড়া নিলেন।প্রথম আলোড়নকারী প্রযোজনা উৎপল দত্ত রচিত-নির্দেশিত ও অভিনীত নাটক অঙ্গার ১৯৫৯ সালে।এর পর আরও বহু নাট্য প্রযোজনা চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৬৫ সালে অঙ্গারের পর দ্বিতীয়বার আলোড়ন সৃষ্টি করে কল্লোল যা নাট্যজগতে ইতিহাস রচনা করেছে।তাঁর সৃষ্ট “মানুষের অধিকারে” নাটকে “স্যাম লিবোভিতস” তাঁর অভিনয় জীবনে স্মরণীয় চরিত্র চিত্রণ।তাঁর অভিনীত বা নির্দেশিত অন্যান্য বাংলা উল্লেখযোগ্য নাটকগুলি হলো গোস্ট্স,পুতুলের সংসার,অচলায়তন, চাঁদির কৌটো,বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ,নীচের মহল,ফেরারি ফৌজ,তিতাস একটি নদীর নাম,ওথেলো,রোমিও-জুলিয়েট,চৈতালি রাতের স্বপ্ন,অজেয় ভিয়েতনাম,লেনিনের ডাক,প্রফেসর মামলক,ঠিকানা,টিনের তলোয়ার, সূর্যশিকার , ব্যারিকেড, টোটা,চক্রান্ত, দুঃস্বপ্নের নগরী,লেনিন কোথায়, তিতুমির,এবার রাজার পালা,স্তালিন,দাঁড়াও পথিকবর,শৃঙ্খল ছাড়া,আজকের শাজাহান, দৈনিক বাজার পত্রিকা,নীল সাদা লাল, একলা চলো রে,লাল দুর্গ,জনতার আফিম ইত্যাদি।

১৯৬৯ সালে নাট্যদলের মধ্যে বিবাদ বিতর্কের ফলে লিটল থিয়েটার গ্রূপ ভেঙে যায় এবং উৎপল ও তাঁর অনুরাগীরা মিনার্ভা ত্যাগ করেন।১৯৭০ সালে এল.টি.জি ভেঙে দিয়ে তিনি তৈরী করেন পি.এল.টি (পিপলস্ লিটল থিয়েটার)।একই সময়ে তিনি বিবেক নাট্যসমাজ নামে যাত্রাদল চালিয়েছেন। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৮ এই ২০ বছরে তিনি কুড়িটি যাত্রাপালা লিখেছিলেন।বেশকিছু পোস্টার নাটকও তিনি রচনা করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে সত্যজিৎ রায়কে সভাপতি করে তিনি ব্রেখট সোসাইটি গঠন করেন।১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে প্রসেনিয়াম ও এপিক থিয়েটার নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন।ফেরারি ফৌজ এর নাট্যকার এবং কল্লোল এর নির্দেশক হিসেবে তাঁর নামে দুবার সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার ঘোষিত হয়। তাঁর প্রাপ্ত অজস্র পুরস্কার ও সম্মানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির দীনবন্ধু পুরস্কার যা পান তিনি ১৯৮৯ সালে।সংগীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ পান ১৯৯০ সালে।এশিয়ান পেইন্টস প্রদত্ত শিরোমণি পুরস্কার পান ১৯৯৩ সালে।কল্যাণী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডি.লিট পান ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর পর।নাট্যকর্মসূত্রে তিনি ব্যাপক বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী শোভা সেনের সাথে ছিলো তাঁর আত্মিক টান।আমার বিশ্বাস তাই পরলোকে তাঁর স্বর্গীয় জীবন নিশ্চই হয়ে উঠেছে শোভাময়।স্যার উৎপল দত্ত তাঁর সন্তানতুল্য প্রযোজনা “কল্লোল’ নাটকের নামে তাঁদের বাসগৃহের নামকরণ করেছিলেন “কল্লোল”।যে কল্লোলকে ১৩ই আগস্ট ২০১৭ অবধি স্বামীর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বুকে আগলে রেখেছিলেন সহধর্মিণী শোভা সেন।রঙ্গমঞ্চের অগণিত নাট্য প্রযোজনা রচনা,নির্দেশনা এবং অভিনয় ছাড়াও প্রায় চল্লিশ বছরের অভিনয় জীবনে তিনি একশোটিরও বেশী যে সমস্ত বাংলা ও হিন্দী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন সেগুলির মধ্যে অন্যতম ভুবন সোম,শেষ অঙ্ক,আগন্তুক,পদ্মানদীর মাঝি,গোলমাল,
মাইকেল মধুসূদন,বিদ্যাসাগর,রাণী রাসমণি,
হারানো সুর,সপ্তপদী,সূর্যশিখা,চৌরঙ্গী,
গুড্ডি,এক আধুরি কাহানি,মর্জিনা আবদুল্লা,কোরাস,শ্রীমান পৃথ্বীরাজ,যুক্তি তক্কো আর গপ্পো,ঠগিনী,অমানুষ,জন অরণ্যে,পালঙ্ক,আনন্দ আশ্রম,জয়বাবা ফেলুনাথ,সুবর্ণ গোলক,সাহেব,আশা ও ভালোবাসা,হীরক রাজার দেশে ইত্যাদি।
আজ জন্মদিনে নতমস্তকে প্রণাম জানাই শিল্পী মহলের শ্রেষ্ঠ সম্পদ উৎপল দত্তের চরনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *