আত্মবলিদান দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি

District News

নিউজ ফ্রন্টলাইনার ওয়েব দর্শক,ফেব্যটি দাঁড়,২৩ শে মার্চ:২৩ মার্চ, ১৯৩১। সন্ধ্যে ৭ঃ৩০। লাহোর জেলের দেওয়ালের মধ্যে চুপিচুপি তিনজনের ফাঁসি দিলো ব্রিটিশ সরকার। তারপর জেলের পেছনের দেওয়াল ভেঙ্গে গর্ত করে, সেই গর্ত দিয়ে মৃতদেহগুলোকে পাচার করে নিয়ে যাওয়া হলো গান্ডাসিংওয়ালা গ্রামে, সেখানে পুড়িয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলো।
নির্দিষ্ট সময়ের ১১ ঘন্টা আগে শহীদ হলেন ভগত সিং, রাজগুরু আর শুকদেব।

যাদের নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের এত সতর্কতা, জনতার ক্ষোভের মুখে পড়তে হতে পারে তাই আগেই যাদেরকে লুকিয়ে ফাঁসি দিয়ে দেওয়া হলো, তাদের মধ্যে অন্যতম ভগত সিং।
আমরা ছোটবেলা থেকেই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিষয়ে পড়ি, তারপর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা স্বাধীনতা দিবসে এই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম আউড়ে যাই, সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীকে এক লাইনে রেখে, তখন আমরা ভুলে যাই যে যেই স্বাধীনতার জন্যে এনারা লড়েছেন, শহীদ হয়েছেন, সেই স্বাধীনতার ধারনা এদের প্রত্যেকের কাছে আলাদা। ভগত সিং এদের মধ্যে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ন, কারন মাত্র ২৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করবার সময় তার কাঙ্খিত স্বাধীন ভারতের চরিত্র তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছিলো।

ভগত সিং এর লেখা দুটি প্রবন্ধ, যা প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীর অবশ্যপাঠ্য – ‘কেন আমি নাস্তিক’ আর ‘তরুন রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি’ – তে তিনি সাফ জানাচ্ছেন তার আদর্শ দেশের চরিত্র – ‘সমাজনতান্ত্রিক নির্মাণ, মার্ক্সবাদী ধারনার আদলে’। তিনি প্রশ্ন করছেন – ‘কৃষক ও শ্রমিকদের কে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে আহ্বান করা হবে কিসের ভিত্তিতে? শুধু আবেগ? এই স্বাধীনতায় তাদের লাভ কি? এর জন্যে বলিদান দিয়ে তারা কি পাবে? তাদের কি এসে যায় যদি লর্ড রিডিং এর জায়গায় পুরুষোত্তমদাস ঠাকুরদাস বসে আর লর্ড আরউইনের জায়গায় তেজ বাহাদুর সাপ্রু বসে? তাদের কাছে একমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম হলো বিপ্লব – সর্বহারার দ্বারা চালিত এবং সর্বহারার জন্যে বিপ্লব!’ এ ছাড়া তিনি ছদ্মনামে ‘কীর্তি’ নামক পত্রিকার জন্যে লিখতেন, যা ছিলো কীর্তি কিষাণ পার্টির (ওয়ার্কার্স এন্ড পেজান্টস পার্টি) মুখপত্র, যা সেইসময় ভারতে বেআইনি কমিউনিষ্ট পার্টির ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশন। মার্ক্স, লেনিন, ট্রটস্কির ভাবনায় অনুপ্রানিত হয়েছেন, আবার বাকুনিনের আদর্শকেও গ্রহন করেছেন, নৈরাজ্যবাদের স্বপক্ষে বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন। লিখেছেন ‘নৈরাজ্যবাদ শব্দটিকে বিকৃত ভাবে ব্যাবহার করে ভয়াবহ করে তোলা হয়েছে। আমার কাছে নৈরাজ্যবাদের লক্ষ্য হলো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইশ্বর, ভগবান, রাষ্ট্র এবং ব্যাক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা কে নির্মুল করা।’ এই কারনেই বস্তুবাদী এবং মার্ক্সবাদী হয়ে বারবার দেশে একটি বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পার্টি গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে লিখে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামকে স্রেফ জাতীয়তাবাদে আবদ্ধ না করে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগানের তলায় আগামী দিনের ভারত এবং রাষ্ট্রের চরিত্রকে তুলে ধরে, সেইসময়কার বিভিন্ন রাজনীতির অভিমুখ থেকে তিনি কিঞ্চিত স্বতন্ত্র।

হিন্দুস্থান রিপাব্লিকান এসোশিয়েসনের সদস্য ভগত সিং যখন ফিরোজশাহ কোটলার মিটিং এ সংগঠনের নাম বদল করে হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাব্লিকান এসোশিয়েসন রাখছেন, সংগঠনের লিফলেটে ‘কমরেড’ সম্মোধন করে জনগনের উদ্দ্যেশ্য নিজেদের কর্মসূচীর প্রচার করছেন, একইসাথে হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগকে তুলোধনা করছেন, ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছেন, বারবার করে অন্যান্য স্বশস্ত্র সংগ্রামীদের সতর্ক করছেন সমস্ত রকম ধর্মীয় সংগঠনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করতে, গান্ধীর আন্দোলনের পদ্ধতি এবং কংগ্রেসের শ্রেনীচরিত্র কে তুলোধনা করছেন, এবং ২৩ বছর বয়সেই লাহোরে কোর্টে দাঁড়িয়ে তার বর্নিত ‘ইনকিলাব’ এর লক্ষ্যের বর্নণা দিচ্ছেন, অর্থনৈতিক আঙ্গিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে তুলে ধরছেন দেশের মানুষের সামনে, সেই সময়কালে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে বোধহয় উনিই হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে একজন যিনি দেশের ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ কে সম্পূর্ন বস্তুবাদী আঙ্গিকে বিশ্লেষন করতে পেরেছিলেন।

যে ঘটনার সূত্রে তিনি এবং বটুকেশ্বর দত্ত গ্রেপ্তার হন – এসেমব্লিতে বোমা নিক্ষেপ করা, তার কারন খুজতে গেলেও চমকিত হতে হয়। বম্বের মিল শ্রমিকদের দীর্ঘ স্ট্রাইক চলছে তখন, কিছুতেই স্ট্রাইক ভাঙ্গা যাচ্ছে না, এমনকি ব্রিটিশ আইনকেও ব্যাবহার করা যাচ্ছে না কারন সেখানে স্ট্রাইকের অধিকার স্বীকৃত। ভারতীয় মিল মালিকরা সোজা গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের পায়ে পড়ে গেলো। ভাইসারয় নিজের ভিটো ক্ষমতা ব্যাবহার করে এসেম্বলিতে দুটো বিল পাশ করাতে চাইলেন – পাব্লিক সেফটি বিল আর ট্রেড ডিসপুট এক্ট, যার মাধ্যমে আইনত এই স্ট্রাইক ভাঙ্গা যাবে, এবং আগামীদিনে শ্রমিকদের পক্ষে স্ট্রাইক করাই অসম্ভব করে তুলবে। ভগত সিং রা বেছে নিলেন এই বিল পাশের দিনকেই, এই বিলের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ জানাতে। অর্থাৎ এখানেও তিনি শ্রেনী রাজনীতিকে সর্বোচ্চ স্থান দিচ্ছেন, অর্থনৈতিক শোষন কে আসল শত্রু মনে করছেন।

তাই আজকে যখন দেখা যায় যে এই ভগত সিং কে আপন করবার চেষ্টা করছে বিজেপি এবং সংঘ পরিবার তখন ভারতীয় হিসেবে লজ্জা হয়। সংঘ পরিবারের কিছু করবার নেই, ওদের নিজেদের কোন আইকন নেই স্বাধীনতা সংগ্রামের যাকে তুলে ধরতে পারবে, কারন স্বাধীনতা সংগ্রামের গোটা সময়কালটাই ওদের কেটেছে ব্রিটিশদের পা চেটে এবং দালালি করে। এখন ওরা ভড়ং করে জাতীয়তাবাদী সেজেছে, তাই এদিক ওদিক হাত মেরে দু একটা আইকন জোগাড় করবার চেষ্টা করছে। কিন্তু শেষমেষ ভগত সিং! ভগত সিং যে বড় কঠিন জিনিস! হিন্দুত্ববাদীরা ভগত সিং কে হজম করতে পারবে না। ওদের নেতা সাভারকার যখন জেলে বসে ব্রিটিশ সরকারকে মুচলেকা লিখে ক্ষমাপ্রার্থনা করছে, ভগত সিং তখন ব্রিটিশ সরকারকে চিঠি লিখে দাবী জানাচ্ছে যে সে যুদ্ধবন্দি, তাই ফাঁসি না, ফায়ারিং স্কোয়াড বা তোপের সামনে তার মৃত্যদন্ড হওয়া উচিত। নাস্তিক, মার্ক্সবাদী ভগত সিং, যে প্রতিটা ক্ষেত্রে ধর্ম এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোর বিরোধিতা করে এসেছে, তাকে আপন করবে বিজেপি এবং আরএসএস?

ভগত সিং যখন জেলে, তখন তাকে জেল ভেঙ্গে বার করে আনবার জন্যে অনেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই সময় হিন্দু মহাসভা থেকে বার্তা যায় HSRA র ইয়াশপালের কাছে, তারা ৫০,০০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করতে চায়, কিন্তু এর বদলে মহম্মদ আলি জিন্নাহকে HSRAর বিপ্লবীদের খুন করতে হবে। HSRAর সেই সময়কার নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ সরাসরি এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন, তিনি জানান তারা ভাড়া করা আততায়ীর দল নয়।

শহীদ কমরেড ভগত সিং এর মৃত্যুদিবসে আমাদের লক্ষ্যস্থির হোক, তার স্বপ্নের শোষনমুক্ত ভারত হয়তো আমাদের জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারবো না, কিন্ত তার legacy কে কিছুতেই সংঘ পরিবারকে দখল করতে দেবো না। কমরেড ভগত সিং এর লেখা থেকে কয়েকটি লাইন মনে রাখি,

‘একজন ব্যাক্তিকে মারা সোজা, কিন্তু তার ভাবনা কে নয়। বড় বড় সাম্রাজ্য গুড়িয়ে গেছে, কিন্তু আদর্শরা টিকে রয়েছে’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *