মর্মান্তিক মৃত্যু বিজ্ঞান কর্মী সর্প বিশারদ অনুপ ঘোষের

District News

নিউজ ফ্রন্টলাইনার ওয়েব ডেস্ক, কলকাতা ৩ রা নভেম্বর:এ যেন আরেক স্টিভ আড়ুইন, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের উত্তর ২৪ পরগণা জেলা কমিটির সদস্য অনুপ ঘোষ আর নেই। প্রকৃতি ও পশু প্রেমিক, মৃদুভাষী এই সর্প বিশারদ মানুষটি ছিলেন বিজ্ঞান মঞ্চের প্রথম সারির নেতৃত্ব। সাপ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছিল অনন্ত। সাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের হাজারো ভুল ধারনা ও কুসংস্কার দূর করতে, যখন যেখানে ডাক পেয়েছেন তিনি ছুটে গেছেন সেখানেই। মানুষকে সচেতন করতে ঘুরে বেড়িয়েছেন জেলার নানা প্রান্তে। কোথাও বিষাক্ত সাপের দেখা মিললেই বন দপ্তর থেকে তাঁর ডাক পরতো ঘনঘন। সাপ ধরে তাদেরকে জঙ্গলের নিরাপদ আশ্রয়ে ছেড়ে দেওয়াতেই আনন্দ খুঁজে নিয়েছিলেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার বন দপ্তরের ডাকেই নৈহাটির হাজিনগর অঞ্চলে একটি বাড়িতে সাপ ধরতে গেছিলেন অনুপ ঘোষ। দুটি সাপ অক্লেশে ঝোলায় ভরার পর তৃতীয় সাপটিকে ঝোলাবন্দী করতে গিয়ে মুহূর্তের অসতর্কতায় তাঁর হাতের আঙুলে ছোবল মারে প্রায় পাঁচ ফুটের চন্দ্রবোড়া। এর আগে সুচারু দক্ষতায় কত যে সাপ তিনি ধরেছেন তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু দুর্ঘটনাটা ঘটল সেই দিনই। সঙ্গে থাকা বনদপ্তরের আধিকারিক তাঁকে তখনই নিয়ে যান নৈহাটি হাসপাতালে। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে আসা হয় কল্যানী জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল হাসপাতালে। খবর পেয়ে পৌঁছে যান সমর চ্যাটার্জী, সুকুমার ঘোষ, ডা. অশোক সরকার, সফল সেন, অনিন্দিতা ভৌমিক ও অন্যান্য বিজ্ঞান মঞ্চের নেতা কর্মীরা। শুরু হয় চিকিৎসা। প্রথম দিকে সাড়াও দেন চিকিৎসায়। এমন কি সাপ ধরে তাদের বাঁচানোর এই মহৎ কাজ ভবিষ্যতে চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি। কিন্তু গতকাল দুপুরের পর থেকে তাঁর অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। প্রবল পেট ব্যথা আর শ্বাস কষ্টের সঙ্গে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত আসতে থাকে। রক্তচাপ ও নাড়ির গতি শ্লথ হতে শুরু করে। ওখানকার চিকিৎসকরা এক কঠিন লড়াই শুরু করেন। প্রায় সর্বোচ্চ মাত্রায় এন্টিভেনিন (প্রতিবিষ) প্রয়োগ করা সত্বেও তেমন কাজ না হওয়ায় গভীর রাতে তারা রোগীর ডায়ালিসিস করানোর উদ্যোগ নেন। ডায়ালিসিসের পরেও রক্তচাপ ভয়াণক বাড়াকমা করতে থাকায় এবং ফুসফুসে জল জমতে থাকায় তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। অত রাতেও অভীক সেনগুপ্ত, অনিন্দিতা ভৌমিকরা হাসপাতালে ছিলেন।

কল্যানী হাসপাতালে এই অবস্থায় যা যা করনীয় চিকিৎসকরা সমস্ত কিছুই করেন। তবু তাঁকে কলকাতায় আনার সিদ্ধান্ত নেন আত্মীয়রা। অস্থায়ী ভেন্টিলেশন সহ তাঁকে এ্যামবুলেন্সে আরজি কর হাসপাতালে আনা হয়। তরুণ বিজ্ঞান কর্মী অভীক সেনগুপ্ত, একজন বনাধিকারিক (নাম জানা হয় নি), অনিন্দিতা ভৌমিক, সমরনাথ চ্যাটার্জী, অঞ্জন মজুমদার, জেলা সম্পাদক সফল সেন প্রমুখ সকাল থেকেই অনুপ ঘোষের সঙ্গে ছিলেন। শ্যামল চ্যাটার্জী, মিলন গাইন, সৌরভ চক্রবর্তীরা তার পাশে থাকার শেষ চেষ্টায় ব্রতী হন।। ইতিমধ্যে জনবিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মী ডাক্তার ফুয়াদ হালিমের পরামর্শে তাঁকে ব্যারাকপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ব’লে ঘোষণা করেন। সেই সময় গার্গী চ্যাটার্জী সহ গণ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বিধি অনুযায়ী পোস্টমর্টেমের পর আগামি কাল দুপুর আড়াইটায় অনুপ ঘোষের মরদেহ তাঁর আত্মীয়দের হাতে তুলে দেবে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চন্দ্রবোড়া বা রাসেল ভাইপারের বিষ বড় ভয়ঙ্কর। বহুক্ষেত্রে এ্যান্টিভেনিন কাজ করে না। চন্দ্রবোড়ার বিষে থাকে একাধিক উৎসেচক যা রক্তকে দ্রুত তঞ্চিত করে। এই বিষের প্রভাবে পিটুইটারি গ্রন্থি কর্ম ক্ষমতা হারাতে পারে (পিটুইটারি ইনফার্কসন), চোখের কনজাংটিভা ক্ষতিগ্রস্ত হ’তে পারে (মায়ানমারে এমনটা দেখা যায় বেশি), অন্ত্রে রক্তপাত, ফুসফুসে জল জমা, পেশিকোষ ছিঁড়ে মায়োগ্লোবিন রক্তে মেশা (রাবডোমায়োলাইসিস), স্নায়ুর প্রান্তসন্নিকর্ষের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে বিকার গ্রস্থতা, এবং সর্বোপরি মারাত্মক রেনাল ফেলিওর বা বৃক্কের কার্যকারিতা ধ্বংস হওয়ার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। একবার স্নায়ু বিকার ও বৃক্কের কার্যকারিতা ধ্বংস পেতে শুরু করলে এ্যান্টিভেনিন কাজ নাও করতে পারে। অনুপ বাবুর ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়ে থাকবে।

অনুপ ঘোষের এই অকাল প্রয়ানে উত্তর ২৪ পরগণা জেলার জনবিজ্ঞান আন্দোলনের পক্ষে এক বড় ধাক্কা। জেলা তথা রাজ্যের জনবিজ্ঞান কর্মীদের কাছে এক দুর্বহ শোকের দিন।

(সংগৃহিত-চৈতালি নন্দী)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *